শুক্রবার   ১৪ মে ২০২১   বৈশাখ ৩১ ১৪২৮   ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

একটু শীতের উষ্ণতার খোঁজে

প্রকাশিত: ১৩ ডিসেম্বর ২০২০  

প্রকৃতিতে পাতাঝরার দিন আসন্ন। হেমন্তের বিদায়ের প্রহরে শীতের গুছিয়ে বসার তুমুল তোড়জোড়ের প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে নিসর্গের ওপর। আর এ নৈসর্গিক রূপবদলের ছাপ দৈনন্দিন জীবনের পুরো চালচিত্রকে পাল্টে দেয়ার জন্যও নিচ্ছে বিপুল প্রস্তুতি। আবহমান বাংলার চিরায়ত ষড়ঋতুমণ্ডিত বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির যে মায়াবী আবেশ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নানাভাবে স্পর্শ করে যায় সেই প্রাকৃতিক আবহের হাত ধরেই প্রতিদিনকার কাজকর্ম, চলাফেরায় আসে বাহুমাত্রিক ছন্দ। যদিও জীবনের এই ছন্দের গহনে রয়েছে এক অনন্তকালীন ধারাবাহিকতা। তারপরেও সেই ধারাবাহিকতাকে ছাপিয়ে জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে বেজে ওঠে নতুন সুরের মূর্ছনা। বিশেষত বাঙালির জীবনের এই রঙবেরঙের ঘূর্ণায়মাণ ঋতু বৈচিত্র্যের স্বাদ এক ভিন্ন আনন্দকে ছড়িয়ে দিয়ে যায়। আর এই স্বাদ শুধু জীবনযাপনে নয়, সবকিছুকেই ছুঁয়ে যায় নিবিড়ভাবে। বাংলার আদিগন্তে রয়েছে মন ভুলানো প্রকৃতির বর্ণিল ছোঁয়া। যে ছোঁয়া সবুজ-শ্যামল স্নিগ্ধ নিসর্গের অবগাহনে সিক্ত করে তোলে জীবনের প্রতিটি প্রহর। হেমন্তের নতুন ধানেরও বিমুগ্ধ ঘ্রাণের হাতে হাত রেখে উঠানের সুগন্ধি কাঁঠালিচাঁপার গাছের ছায়ায় যখনি শীতের কিশোর এসে বকুল ফুলের মালা হাতে দাঁড়ায়। তখনও প্রকৃতির রূপটাও থাকে যেন সেই শীতের কিশোরের বুক পকেটে ভাঁজ করা রুমালের মতো। যখন হেমন্ত-শীতের আঁজলায় ফিকে রোদের ঝালর ফোটা বিকেলটাকে তুলে দেয়। তখনই শীতের কিশোর তার কুয়াশাডোবা ভাঁজ করা রুমালের ভাঁজ খুলে বিছিয়ে দেয় গ্রাম বাংলার ধুঁধু মাঠ-আর নগর জীবনের ব্যস্ততম সময়ের রোজকার এক চিলতে অবসর জাগা ক্ষণে। চারদিকে শুরু হয় শীতকে বরণ করে নেয়ার এক মহান উৎসব। একদিকে ভাপা, পুলি, নকশি, চিতই, বিবি সাহেবসহ অভিজাত নানা পদের ফিটা এবং সুগন্ধি চালের পায়েস আর ক্ষীর। অন্যদিকে বদলে যায় জীবনের ধরন। পাল্টে যায় প্রতিটা মানুষের পোশাক-আশাক, রূপচর্চা, সাজসজ্জাসহ প্রয়োজনীয় সব কিছু। কেননা শীতের হিমেল হাওয়া আর কনকনে অনুভূতি শহর, বন্দর, গ্রাম, গঞ্জ, বিল, ঝিল সর্বত্র ভিন্ন এক গভীর শীতার্ত উপলব্ধি ছড়িয়ে দেয় স্বাভাবিক নিয়মে। খাওয়া, দাওয়া থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য বাড়তি তদারকিও বেড়ে যায় মায়েদের তরফ থেকে। একই সঙ্গে বয়সী মানুষও একটু সতর্ক হয়ে যায়। বিশেষ করে সবার মধ্যেই শুরু হয় উষ্ণতার খোঁজ। শীত এমন এক ঋতু যে ঋতুর ভেতর একরত্তি উষ্ণতা যেন এক মহাসম্পদ আর দামি বস্তু হয়ে ওঠে। ফলে শীতের পোশাকের জন্য শুরু হয় আকুলি বিকুলি, কাজুয়ালি ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত পোশাকের জায়গায় স্থান করে নেয় শীতের পোশাক। হাফশার্ট, সিল্ক, স্লিভলেস ড্রেসের জায়গায় চলে আসে কোট, ব্লেজার, স্যুট, জাম্পার, জ্যাকেট, মাফলার, কানটুপি, ফারকোট, শাল, চাদর, ফুলস্লিভ শার্ট, টি-শার্ট, ফতুয়া, থ্রি-পিস কার্ডিগান, কম্ফর্টার গলাবন্ধ, সুতির এক্সক্লুসিভ শাড়ি, গর্জিয়াস শাড়ি, তাঁতের শাড়িসহ নানা ডিজাইনের শীতের পোশাক। পাশাপাশি ধুলোধূসর বৃষ্টিহীন শীতকালজুড়ে পোশাকের রঙেও আসে বিবর্তন।

গাঢ় রঙটাই সাধারণত শীতে বেশ ফেভার করে সবাইকে। এদিক বিবেচায় নিয়ে ফ্যাশন ট্রেডেও চলে শীতের পোশাক তৈরির প্রস্তুতি। সব বয়সী মানুষের জন্যই আউটলেটের কালেকশনে আসে শীত উপযোগী নানা ধরনের পোশাক।

শীতে এই যে প্রকৃতির বদলে যাওয়া। এই বদলে যাওয়ার ছবিটা দেশজুড়েই বিস্তৃত থাকে পুরো শীতকালজুড়ে কী গ্রাম, কী নগর বা শহর। সর্বত্রই উত্তরের ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যেতে থাকে প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী। ভোরের শিশির ধোয়া পথের অদূরে গাজগাছালির ফাঁক গলিয়ে যখন কুয়াশাচ্ছন্ন মিষ্টি রোদের দেখা মিলে তখনও মনে হবে যেন এর চেয়ে প্রত্যাশিত আর কিছু নেই। নগরজীবনে শীত অনেকটা ঘরোয়া ঋতু হিসেবে চিত্রিত হলেও গ্রামবাংলায় এর প্রভাবটা বিশেষভাবে অনুভূত হয়। গ্রামের মানুষের শীতের পোশাক সংগ্রহের বেলায়ও থাকে একটা দৈন্য। একটি কানটুপি, মাফলার কিংবা একটি সাধারণ চাদর যেমন অনেকের থাকে না। থাকে না শীত নিবারণের জন্য লেপ-তোষক, কম্বল তো দূরে থাক কখনও সখনও একটা ভালো কাঁথাও। এই হল গ্রামীণ জীবনের স্পষ্ট ধারার চিত্র। এই চিত্রটাকে বদলে দিতে সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। শীতের আনন্দ যেমন আছে তেমনি আছে কষ্টও। এই আনন্দ আর কষ্টের আপ টেনে করে এসেই যেন বাংলার শুষ্ক নদী, খাল, বিল, জলাশয়, ধূসর মাঠে মাঠে হলদে সর্ষের ক্ষেত্রে ধবল বকের মতো নামবে শীত। আর বদলে যাবে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত। বাড়ির লনে সন্ধ্যায় আলো জ্বেলে শুরু হবে ব্যাডমিন্টন আর টেনিস খেলার সূচনা। পাশাপাশি গ্রামগঞ্জে পৌষমেলা থেকে শুরু করে যাত্রাপালা, নাটকসহ নানা ধরনের গ্রাম্য উৎসবে ছেয়ে যাবে সারা বাংলার মাঠ-প্রান্তর। বৃষ্টি-বাদলের ঝক্কি না থাকায় অনেকে আবার এই শীতেই বেরিয়ে পড়বে ভ্রমণে। কেউবা একা কেউবা সপরিবারে। নদী, বিল, জলাশয়ে দেখা মিলবে নানা প্রজাতির অতিথি পাখির। গ্রামে খেজুরের রস, আর খেজুরের গুড়ের ক্ষীরের ঘ্রাণ-সৃষ্টি করবে এক ভিন্ন প্রেক্ষিত ভিন্ন মাত্রা। শীতের নিবিড় সান্নিধ্য উপভোগ করতে কেউবা দূর পাহাড় কিংবা সমুদ্রের কাছেও চলে যাবে। তারপর এক সময় ছুটি মিলবে শীতেরও। যে দু’মাস (পৌষ-মাঘ) থাকবে শীত এই দু’মাসের প্রতিটি প্রহরই এক নতুন সিম্ফনিতে গুঞ্জরিত হবে। প্রত্যেককেই দেখা যাবে ভিন্ন ভিন্ন পোশাক এবং অভিব্যক্তিতে। ফ্যাশন ধারাতেও থাকবে চমৎকার বৈচিত্র্য। যে বৈচিত্র্য নগর জীবনের শীতগিরিকে কিছুটা হলেও মানিয়ে নেবে। কাশ্মীরী শাল, সুয়েটারের ভাঁজে ভাঁজে উঁকি দেবে শীতের মহা উপস্থিতি। ধূসরাভ শীতের দিবসগুলো নতুন এক চিত্রগাথা প্রকৃতির ক্যানভাসে এঁকে দেবে শিশিরস্নাত রৌদ্রের কোমল তুলিতে।

স্টার ভয়েস ২৪
স্টার ভয়েস ২৪
এই বিভাগের আরো খবর