রোববার   ২৪ অক্টোবর ২০২১   কার্তিক ৯ ১৪২৮   ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ডাক্তার বনাম কসাই!

মুরাদ নূর, সুরকার ও সংস্কৃতিকর্মী

প্রকাশিত: ৮ এপ্রিল ২০২০  

 

নশ্বর এই পৃথিবীতে মানুষ বেঁচে থাকতে জীবিকার প্রয়োজন হয়। এই জীবিকার জন্য'ই মানুষ বহু ন্যায়-অন্যায়ে লিপ্ত থাকে! কখনো মানুষ নিজেই ভুলে যায় সে কে? পৃথিবীতে আসলে কি তার কাজ? কেনো মানুষ হয়ে জন্ম? এই প্রশ্ন জালেই মানুষ কাটিয়ে দেয় পুরো জীবন। তবুও মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ছাড়া বাকী মানুষ এর উত্তর খুঁজে পায় না। এই উত্তর খুঁজতে যেয়ে মানুষ বিভিন্ন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করে! কেউ নিয়োজিত হয় নিজের ইচ্ছেতে! কেউ নিয়োজিত হয় পরিবারের ইচ্ছেতে! যখন পরিবার আর নিজের ইচ্ছে প্রেমময় না হয়, তখনই ঘটে পেশাগত যতে অশান্তি। এই পেশাগত কারনেই কেউ হয় আলোচিত। কেউ হয় সমালোচিত।

ছোটবেলায় প্রতিটি শিশু-কিশোরের ইচ্ছে থাকে তার পেশাগত পছন্দ। তখন আমারও তাই জেগেছিলো। পুরোপুরি বুঝে উঠার আগ পর্যন্ত বাবা মায়ের স্বপ্নই ছিলো আমার স্বপ্ন। আমাদের সমাজে যা জোর করে ৯৮% সন্তান'ই বন্দী থাকে। বাবা মায়ের ইচ্ছে থাকে সন্তান ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, কিংবা পাইলট হবে। এগুলো ছাড়া কোনো বাবা মা জীবনেও স্বপ্ন দেখে না। পৃথিবীর অন্য পেশা মনে হয় তাদের কাছে নস্যি। উপজেলার স্কুলগুলোর মধ্যে মেধাবী হিসেবে আমি বেশ পরিচিত ছিলাম। সে হিসেবে বাবা মায়ের বাধ্যগত সিদ্ধান্ত সন্তান ডাক্তার হবে। আমারও সেভাবে বেড়ে উঠা। বড় হওয়ার সাথে সাথে তাঁদের চাওয়া পাওয়ার উত্তর খুঁজতে থাকলাম। কেনো আমি ডাক্তার হবো? খুঁজে পেলাম। প্রথম কারন, ডাক্তাররা অনেক অর্থ উপার্জন করে। দ্বিতীয় কারন, সন্তান অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু তাদের মূখ্য কারন ছিলো সন্তান পয়সাওয়ালা হবে। এই কারন আমার ভালো লাগেনি। যৌক্তিক মনে হয়নি। ডাক্তার হয়ে যতো মানুষের পাশে দাঁড়ানো যাবে! আমি তারও বেশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। তাই আর আমার ডাক্তার হওয়া হলোনা।

আমার বাবা মায়ের মতো অনেকের পরিবারের সিদ্ধান্তেই জোর করে পেশায় নিয়োজিত হতে হচ্ছে। যার ফলে ঐ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান, ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা নাই বললেই চলে। সমাজের বেশির ভাগ ডাক্তারই হচ্ছে মেধার চেয়ে পরিবার এর পয়সার কারনে। যার ফলেই কখনো কখনো নচিকেতার কথা অনুযায়ী তাঁরা কসাই হয়ে উঠে। দেশ ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষায় কিছু পেশার মানুষ  নিজ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি পৃথিবীকেও ছাড়িয়ে যায়। তেমনি একটি পেশা ডাক্তার। যা একমাত্র পেশা সৃষ্টিকর্তার পরে তারাই মৃত্যুর আগে সর্বশেষ ভরসা।

আজ কেনো এই নিয়ে এতো কথা বলছি! অসহায় মানুষের সহায়তার একমাত্র ভরসা ডাক্তার। বিশ্বের মানুষ আজ চরম অসহায়। এ-যুগের মানুষগুলো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি এমন অসহায়ত্ব বরণ করতে হবে! কিন্তু ধ্রুব সত্যি আজ মানুষ অসহায়! এই অসহায়ের একমাত্র সহায় সৃষ্টিকর্তা! প্রভুর প্রতিনিধি হিসেবে আছেন এখন মহামান্য ডাক্তার বন্ধুরা। এই মহামারিতে আমাদের দেশের ডাক্তারদের সেই বোধ কি এসেছে.? হয়তো এসেছে! আবার আসে নাই! ঐ যে মেধার জোরে যারা ডাক্তার হয়েছে তাদের বোধ এসেছে, মানুষের জন্যই তাদের জন্ম! আবার যারা পরিবার এর পয়সার গরমে যারা ডাক্তার হয়েছে, তারা নিজ ও পরিবারের'ই রয়ে গেলো! তাদের'ই পৃথিবীর অসহায় অবস্থায় খুব খুব পিছুটান।

পৃথিবীর অসহায় মানুষদের কান্নায় তাদের ভুমিকা কি হওয়া উচিত ছিলো! মানুষরুপী সেই ভগবানদের কি এই বোধের প্রশ্ন জাগে.? একজন ডাক্তারের কি আসলে নিজের জন্যই জন্ম? পরিবারের ওমক সন্তান ডাক্তার! এই পরিচয়ের জন্যই জন্ম? নামকরা ডাক্তার হয়ে ইনভেস্টকৃত টাকা ভিজিটের মাধ্যমে সুদেআসলে তুলে নেওয়ার জন্যই কি জন্ম? না সৃষ্টিকর্তার সঠিক প্রতিনিধি হয়ে অসহায় মানুষের কল্যানে নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য'ই জন্ম? এ প্রশ্ন কেবল'ই অসহায় পৃথিবীর কাছে!

লেখকঃ মুরাদ নূর
সুরকার ও সংস্কৃতিকর্মী

 

স্টার ভয়েস ২৪
স্টার ভয়েস ২৪
এই বিভাগের আরো খবর